শিক্ষা মানে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন নয়

শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনাকে জাগ্রত করে এবং তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। কিন্তু অনেকেই শিক্ষা বলতে কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানকেই বোঝেন, যা আসলে শিক্ষার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বাস্তব জীবনে টিকে থাকা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, নৈতিকতা বজায় রাখা, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করা—এসবই শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পুথিগত জ্ঞান একজনকে হয়তো পরীক্ষায় ভালো নম্বর এনে দিতে পারে, কিন্তু চরিত্র, সততা, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা। একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ কেবল তথ্যের ভাণ্ডার নয়; বরং সে জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করে।

ধরা যাক, গ্রামের এক ছেলে—রাশেদ। পড়াশোনায় ভালো, পরীক্ষায় সব সময় প্রথম হতো। কিন্তু একদিন গ্রামে বন্যা হলো। আশপাশের সবাই যখন আতঙ্কে, তখন রাশেদ শুধু বই হাতে বসে থাকেনি। সে আশ্রয়হীন মানুষদের সাহায্য করেছে, খাবার পৌঁছে দিয়েছে, শিশুদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছে। তার এই মানবিক উদ্যোগের জন্য সবার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছিল। সেই দিন রাশেদ বুঝেছিল—শিক্ষা শুধু বইয়ের অক্ষরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার নাম।

আবার দেখুন, বিশ্বের ইতিহাসে নেলসন ম্যান্ডেলা বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ব্যক্তিত্বরা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন না, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব, সাহস, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা পুরো জাতিকে পরিবর্তন করেছে। তারা প্রমাণ করেছেন—প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখানো এবং অন্যের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করার মানসিকতা তৈরি করা।

আজকের বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের শিক্ষাকে হতে হবে বহুমাত্রিক। শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের জীবন দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

এছাড়া, শিক্ষা আমাদের শেখায় সহনশীলতা, ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা করা এবং অন্যের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা। একজন শিক্ষিত মানুষ জানে কীভাবে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে আবার এগিয়ে যেতে হয়। এই মানসিক দৃঢ়তাও শিক্ষারই ফল।

অতএব, শিক্ষা মানে কেবল পুথিগত বিদ্যা অর্জন নয়—এটি মানুষের মনের জানালা খুলে দেয়, চিন্তা-ভাবনার পরিধি বাড়ায় এবং তাকে একজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। সমাজ ও জাতি গঠনে এমন শিক্ষার বিকল্প নেই।